আদি বাসন্তী দূর্গা পূজা ও বর্তমান শারদীয়া দূর্গা পূজার ইতিহাস। কৃত্তিবাসি রামায়ণ অনুসারে, রাবণ ছিলেন শিবভক্ত। তাই সদা শিব তাকে রক্ষা করতেন।
আদি বাসন্তী দূর্গা পূজা ও বর্তমান শারদীয়া দূর্গা পূজার ইতিহাস
পুরাণ মতে বাসন্তী পুজোই বাঙালির আসল দূর্গাপূজো। অতিতে বারোয়ারি পূূজোর রূপ না পেলেও এই পূজো বর্তমানে অনেকের বাড়িতে, পাড়াতে, ক্লাবে আয়োজিত হয়। যদিও পরবর্তী কালে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের দূর্গাপূজোই অন্যতম প্রধান পূজোর মর্যাদা পায়। অশুভ শক্তির বিনাশের জন্য সব কালেই মানুষ আদ্যাশক্তির আরাধনা করেছেন। আর অ-সময়ে আদ্যাশক্তির আরাধনা করায় , আশ্বিনের দূর্গা পূজাকে অকাল বধন বলে সমদ্ধন করেছে আমাদের আদি কবি বাল্মীকি ও বাঙালি কবি কৃত্তিবাস ওঝা। তাই পুরান মতে বসন্ত কালের দূর্গা পুজাই আদি পূজা ।
তাই আজ আমরা আদি দূর্গা পূজা ও বর্তমান দূর্গা পূজার ইতিহাস আমরা জানব।
- পুরাণ মতে বাসন্তী ও আদি দূর্গা পূজার ইতিহাস —
মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থে বাসন্তী পূজার উল্লেখ রয়েছে। যে সত্য যুগে রাজা সুরথ চন্দ্রবংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি এই পৃথিবীর রাজা হয়েছিলেন। সুরথ সুশাসক ও যোদ্ধা হিসেবে বেশ খ্যাত ছিলেন। কোনও যুদ্ধে নাকি তিনি কখনও হারেননি। কিন্তু প্রতিবেশী রাজ্য একদিন তাঁকে আক্রমণ করে আর কাল বশে সুরথ পরাজিত হন। এই সুযোগে তার মন্ত্রী ও সভাসদেরা তার ধনসম্পদ লুটপাট চালায় ও সেনাবাহিনীর দখল নেন। কাছের মানুষের এমন আচরণে স্তম্ভিত হয়ে যান সুরথ। সুরথ মনের দুঃখে বনে চলে আসেন। সেই গভীর জঙ্গলে মেধস মুনির আশ্রম ছিল। সেই আশ্রমেই আশ্রয় নিয়েছিলেন রাজা সুরথ। মেধস ঋষিও রাজাকে সমাদর করে নিজের আশ্রমে আশ্রয় দেন।
কিন্তু বনে থেকেও রাজার মনে সুখ ছিল না। সব সময় তিনি তার হারানো রাজ্যের ভালমন্দের কথা ভেবে শঙ্কিত হতেন। আশ্রমে থেকে মুকুটহীন রাজা সুরথ মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন, কীভাবে হারানো রাজ্য আবার ফিরে পাওয়া যায়।
চিন্তিত রাজা সুরথ একদিন বনের মধ্যে পথ চলতে চলতে সমাধি নামের এক বৈশ্যের সঙ্গে পরিচয় হয়।
তার সঙ্গে কথা বলে সুরথ জানতে পারলেন, বৈশ্যের স্ত্রী ও ছেলেরা তার সব টাকাপয়সা ও বিষয়সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাও তিনি সব সময় নিজের স্ত্রী ও ছেলদের কল্যাণ-অকল্যাণের কথা চিন্তা করে কষ্ট পেতেন।
তখন মেধস মুনি তাঁদের কাছে জগতের সব বিষয়ের অসারতা সম্বন্ধে উপদেশ দেন এবং দেবী আদ্যাশক্তির শরণাপন্ন হওয়ার নির্দেশ দেন।
মেধস মুনির উপদেশে রাজা সুরথ ও সমাধি বনের মধ্যস্থিত নদীর তীরে শ্রীশ্রীচণ্ডীস্বরূপা দুর্গাদেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমা গড়ে তিন বছর উপবাস থেকে পূজা সম্পূর্ণ করলে দেবী দুর্গা-আদিশক্তি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁদের বর প্রদান করেন। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে, রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি, নদী তীরবর্তী মেধা মুনির আশ্রমে, বসন্ত কালেই শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা সম্পূর্ণ করে দেবী প্রতিমা নদীগর্ভে বিসর্জন দিয়েছিলেন। যেটা পরে বাসন্তী পূজা নামে প্রসিদ্ধ হয় আর সেটাই প্রচলিত থাকে।
- বর্তমান দূর্গা পূজার ইতিহাস —
কৃত্তিবাসি রামায়ণ অনুসারে, রাবণ ছিলেন শিবভক্ত। তাই সদা শিব তাকে রক্ষা করতেন। এর ফলে রামের রাবনকে পরাস্ত করা অসম্ভব হয়ে উঠে। তাই ব্রহ্মা রামকে পরামর্শ দেন, শিবের পতনী পার্বতী কে পূজা করে তাকে তুষ্ট করতে। তাতে করে রাবণ বধ রামের পক্ষে সহজসাধ্য হবে। ব্রহ্মার পরামর্শে রাম মাতা পার্বতীর দূর্গা রূপের বোধন, চণ্ডীপাঠ ও পূজার পরিকল্পনা করেন।
আশ্বিন মাসের শুক্লা ষষ্ঠীর দিন রাম কল্পারম্ভ করেন। তারপর সন্ধ্যায় বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস করেন। মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও সন্ধিপূজার পরেও যখন মা দূর্গার দেখা না মেলে, তখন শ্রীরাম ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে পুনরায় নবমীর দিন পূজার আয়জন করেন। হনুমান তাকে ১০৮টি পদ্ম জোগাড় করে দিলেও। মহামায়া রামের পরীক্ষা নেওয়ায় জন্য একটি পদ্ম লুকিয়ে নেন।
একটি পদ্ম না পেয়ে রাম পদ্মের বিনিময়ে নিজের একটি চোখ উপড়ে মা দূর্গাকে নিবেদন করতে যান। তখনি দেবী দূর্গা আবির্ভূত হয়ে রামকে কাঙ্ক্ষিত বর দেন। শরৎকালের সর্বাধিক প্রচলিত এই দূর্গাপূজার আরেক নাম শারাদীয় দূর্গাপূজা । নিয়মমতে এই পূজাটি অকালে হয়েছে বলে এর আরেক নাম অকালবোধন।


COMMENTS