Kshirgram Jogadya Temple in 51 saktipit যোগাদ্যা বাংলার এক লৌকিক দেবতা ও ৫১ পীঠের এক পীঠের দেবী। তার মন্দির পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ক্ষীরগ্রামে
যোগাদ্যা মায়ের মাহাপূজা হয় বৈশাখ সংক্রান্তিরে আর ঐ সময় বেশ ধুম ধামের সাথে পালিত হয় মায়ের পূজ। আজ আমরা জেনে নেব সেই মহাপূজার কিছু অজানা প্রথা।
ক্ষীর কলসী
বিগত বৎসরের চৈত্র সংক্রান্তিতে যজ্ঞকুন্ডে পূর্ণঘট সহকারে যে হোমযজ্ঞ হয়। সেই পূর্ণঘট দত্ত বংশের যে কোনো এক জন (যার পালা থাকে) গর্ভগৃহে বেদিতে স্থাপন করে। ওই পূর্ণ ঘট সারা বৈশাখ মাস পূজা হয়। ওই ঘটকে ক্ষীর কলসী বলে। এবং ওই কলসীর জল পবিত্র বারি হিসাবে সমস্ত দর্শনার্থীরা মাথায় ধারণ করে।

১৫ই বৈশাখ লগন (লগ্ন)
১৫ই বৈশাখ পুরোনো মন্দিরে পূজা পাঠ বিশেষ ভাবে হয়। মন্দিরের চারিধারে গণ্ডি দেওয়া হয়। নূতন পঞ্জিকার রাজা, মন্ত্রী, জলাধিপাত, শস্যাধিপাত এবং দ্বাদশ মাসের দ্বাদশ রাশির নক্ষত্র গত রাশি ফল পাঠ করা হয়। মায়ের বাৎসরিক মহা পূজার লগ্ন শুরু হল। পূজা শেষে শপৎ দেবীদে পুরোহিত, দত্ত, সামন্ত, রায় উপস্থিত সকলে শপত নেয়। মহাপূজায় আমরা সকলে নিমন্ত্রিত, আমন্ত্রিত, অনাহুত সকলকে সমানভাবে সমাদরে প্রতি বৎসরের ন্যায় এই বৎসরও করতে বাধ্য থাকলাম।
ময়ুর নাচ
২৭শে বৈশাখ যজ্ঞকুন্ডে হোম পূজা পাঠ হয়। যে ব্যক্তি চৈত্র সংক্রান্তিতে পূর্ণ ঘট মাথায় করে মন্দিরে নিয়ে যায় ২৭শে বৈশাখ সেই ব্যক্তি পূর্ণ ঘট নিয়ে মন্দিরে যায়। সন্ধ্যায় যজ্ঞ কুন্ডুর কাছ হতে মন্দির পর্যন্ত রাস্তার তে মাথায় নাচ করতে হয়। নাচ প্রথম ডান অঙ্গ দ্বিতীয় বাম অঙ্গ শেষে হাত দুটি জড়ো করে উপরে রেখে জোড়া পায়ে লাফিয়ে উঠতে হয়। এইভাবে যে নাচ হয় তাকেই ময়ূর নাচ বলে। তে মাথায় তে মাথায় নাচ করে মন্দিরে গিয়ে শেষ হয়।
হাল লাঙ্গল
সারা বৈশাখ মাস ক্ষীরগ্রামবাসীরা জমিতে লাঙ্গল দেয় না। মায়ের আদেশ মতে মহাপূজার আগের দিন অর্থাৎ বৈশাখ সংক্রান্তির আগে দিন বিকেলে মামা ও ভাগ্নের দুইটি এ্যাড়ে বাছুর এবং বট কাঠের হাল ও লাঙ্গল তৈয়ারী করে নির্দিষ্ট পথে উত্থান মন্দিরের কাছ হতে শুরু করে উত্তর মাঠ, পর্ব ঘাট দক্ষিণ মাঠ হয় জমিতে লাঙ্গল দিয়ে মন্দিরে ফিরে আসে এবং সঙ্গে থাকে ক্ষীর কলসী।
যজ্ঞকুণ্ডু
উত্থান মন্দিরের পূর্বদিকে একটি পুকুর আছে। সেই পুকুরের নাম ময়ূর গোড়ে। এই পুকুরের দক্ষিণ পারে স্থায়ী কুন্ডু আছে ওই কুন্ডে চৈত্র সংক্রান্তিতে পূর্ণ ঘট সহকারে হোম যজ্ঞ হয় । ২৭শে বৈশাখ হোম যজ্ঞ সহকারে পূজা হয় এবং ৩০শে বৈশাখ হোমযজ্ঞ সহকারে পূজা হয় ।
মহাপূজার সময় মায়ের পূজার বিবরণ
বৈশাখ সংক্রান্তির ভোরে মাকে তোলা হয়। কাঠের চারটি চাকাযুক্ত পাটাতনের উপর মা শায়িত থাকেন। রসি দিয়ে টেনে জলের বাইরে আনা হয়। জলে বাহিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই দত্ত বংশের ছাগ বলিদান হয়। সেই বলিদানের রক্ত চিনি মন্ডা সহকারে মায়ের মুখে দেওয়ার পর মন্দিরের উদ্দেশ্যের রসি টান শুরু হয়। মেলা তলার উত্তরে অবস্থিত উত্থান মন্দিরে রাখা হয়। সারাদিন এবং সারারাত্রি মায়ের দর্শন পায় দর্শনার্থিরা।

যে পাটাতনের উপর মা শায়িত থাকেন – তাকে সগর বা সাগর বলে।
উত্থান মন্দিরেই সামনেই মহিষ বলি হয়। মায়ের দেখা মেলে সারারাত দূরবর্তী গ্রাম ও শহর হইতে লাইন দিয়ে মায়ের দর্শন করেন সকল ভক্তরা। পূজার দিন অন্ন ভোগের ব্যবস্থা থাকে।
মহাপূজার দিন ভোরে 'মা' কে উত্থান মন্দিরে রাখার পর পুরোনো মন্দিরে এই যুদ্ধ আর্য্য ও অনার্য্যের মধ্যে দেখা যায়। এই যুদ্ধই ডোম-চন্ডাল নামে খ্যাত।
ডোম চন্ডাল
ত্রেতাযুগে হনুমান 'মা' কে ক্ষীরগ্রামে রেখে চলে যায়। মা যোগাদ্যা নাম নিয়ে পীঠস্থানে নিজের পূজা নিজেই করিয়ে নেন। সেই সময় সমাজ আর্য্য এবং অনার্য্যের মধ্যে বিভক্ত ছিল। আর্য্যরা হোম-যাগ-যজ্ঞ-পূজা অর্চনা করত, কিন্তু মূর্ত্তি পূজা করত না। অনার্য্যরা দেব-দেবীর পূজা করত এবং দেশ শাসনে যুক্ত থাকত। অনার্যরা আর্যদের অপেক্ষা শক্তিশালী ছিল। সেই কারণে অনার্যরা মা যোগাদ্যার অধিকার কায়েম করে নিয়েছিল। কিছু কাল পর আর্য্যরা অনুভব করে সমাজে মূর্তি পূজার প্রয়োজন আছে। আর্য্যরা কিছু সময় পর মায়ের উপর হতে আনার্য্যদের অধিকার খর্ব করে। আর্য্য সমাজ ভুক্ত ব্যক্তিরা (উচ্চ শ্রেণী সমস্ত) একত্রিত হয়ে মায়ের মন্দির হতে অনার্য্যদের (নিম্নশ্রেণী সমস্ত ডোম, চণ্ডাল, কোল, তিল ইত্যাদি) সকলকে বিতাড়িত করে। এই ভাবে চলতে চলতে অনার্যদের মন্দিরে প্রবেশ নিয়ে অসন্তোশ সৃষ্টি হয়। কিছু দিন পরে অনার্যদের সমস্ত শ্রেণীর মানুষ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং তারা ঘোষনা করে দেয় মহা পূজার দিন ভোরে মা যোগাদ্যা মন্দিরে আসার পর তারা সমবেত ভাবে মন্দিরে প্রবেশ করবে।
তখন “মা” কে দর্শন করা যেত গ্রামের মধ্যে পুরানো মন্দিরে। জল হতে নিয়ে এসে পুরানো মন্দিরে রাখা হত। মহাপূজার দিন ভোরে 'মা' মন্দিরে আসার পরই অনাৰ্য্য শ্ৰেণী ভুক্ত মানুষজন 'ফুল' ডোমের মাধ্যমে মন্দির আক্রমন করে। কিন্তু আৰ্য্য শ্রেণীভুক্ত গ্রামবাসী উচ্চশ্রেণীর মানুষজন এবং পুরোহিতবর্গ আগে জানতে পারে সেই জন্য উচ্চশ্রেণীর পক্ষ্যে বহু লোককে হাজির করান। যেমন ভরত দত্ত, ষষ্ঠ মল্ল (মল্লবীর), কলিগ্রাম, কুরুমূন, কুসুমগ্রাম, নাসিগ্রাম, এরুয়ার। মোজি গ্রাম আসতে পারে নাই) লোকজন হাজির হয়। দুই পক্ষ্যের মধ্যে আর্য ও অনার্য্যর যুদ্ধ হয়। তুমুল যুদ্ধ। যুদ্ধের ফল কেহই পরাজিত হয় নাই। তখন তৃতীয় পক্ষ্যের মাধ্যমে সন্ধি স্থাপন হয়। সন্ধির শর্তগুলি আর্য্যশ্রেণীভুক্ত উচ্চশ্রেণী এবং পুরোহিতবর্গ এবং সমস্ত ব্যক্তিরা সবকিছু মেনে নেয়।
শর্ত –
১। ঠাকুর জল হতে ওঠার সময় এবং জলে যাবার সময় ডোমের অধিকার।
২। বৈশাখ মাসে প্রথম পনেরো দিন ঢাক বাজবে।
৩। বৈশাখ মাসে দ্বিতীয় পনেরো দিন মাদল বাজবে।
৪। মহাপূজার মন্দিরে প্রবেশেরঅধিকার।
এই ভাবে অনাৰ্য্য শ্রেণীভুক্ত নিম্নশ্রেণীর অধিকার পূরণ হয়। বৰ্ত্তমান কালে এই যুদ্ধ কৃত্রিম ভাবে হয়। মহাপূজার দিন ভোরে 'মা' কে উত্থান মন্দিরে রাখার পর পুরোনো মন্দিরে এই যুদ্ধ আর্য্য ও অনার্য্যের মধ্যে দেখা যায়। এই যুদ্ধই ডোম-চন্ডাল নামে খ্যাত।
বাস পূজা
সারাদিন রাত দর্শনের পর ভোরের রাতে মা পুনরায় জলে চলে যান। সন্ধ্যাকালে মশাল দেখানোর প্রচলিত প্রথা আজও আছে। ভোরে মন্দির হতে নামার আগে সুরেশ্বর চক্রবর্তীর বংশ হতে মশাল আসতেই হবে। মশাল আসার পর মন্দির হতে মা জলে যাবার জন্য তৈয়ারী হন। জলে নামার আগে মা ডোমের বলিদানের রক্ত চিনি মন্ডা সহকারে মুখে নিয়ে চলে যান।
COMMENTS