MYTHOLOGY & LEGENDS

কার্তিক মাসের লক্ষ্মী পূজার পৌরাণিক কথা - যেভাবে শুরু হল কার্তিক মাসের লক্ষ্মী পূজা ও বাড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা।

কার্তিক মাসের লক্ষ্মী পূজা ও বাড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা শুরুর ইতিহাস ও গল্পকথা। কার্তিক মাসে প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মী পূজা পাঁচালী ব্রতকথা |

যেভাবে শুরু হল কার্তিক মাসের লক্ষ্মী পূজা ও বাড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা।

হিন্দু ধর্মের মানুষেরা কার্তিক মাসের লক্ষ্মীপূজা করে থাকেন। মনেকরা হয় এই পূজা করলে মা লক্ষ্মী তার সংসারে সর্বদা স্থিরা থাকেন। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনের কাহিনী।


একসময় অবন্তীনগরে ধর্মেশ্বর নামে এক রাজা বাস করতেন। তাঁর রানীর নাম ধর্মদাসী এবং তাঁর পাঁচটি কন্যা ছিল। একদিন পরিবারের সবাই যখন একসাথে বসে গল্প করছিল এমন সময় রাজা পরিবারের অন্যদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কার ভাগ্যে খাও?”

পরিবারের সবাই রাজার মন রাখতে বললেন, “আমরা সবাই আপনার ভাগ্যেই খাই।”

কিন্তু রাজার ছোট মেয়েটি তাতে সায় দিলেন না। তিনি বললেন ,”মা লক্ষ্মী আমাদের সবাইকে আহার জুগিয়ে থাকেন। আমরা যে যার নিজের ভাগ্যে খাই”
এই কথা শুনে রাজা খুব রেগে গেলেন। তিনি বললেন, “আমার সামনে তুই এই কথা বললি কার সাহসে?”


Lakshmi puja

কার্তিক মাসের লক্ষ্মী পূজা


তিনি রেগে গিয়ে বললেন, “আমি প্রতিজ্ঞা করলাম কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে যার মুখ প্রথম দেখবো তার সাথেই তোর বিয়ে দেব। দেখি তুই নিজের ভাগ্যে কি করে খাস! আর মা লক্ষ্মী তোকে কি রকম অন্ন জোগায়!”
এই কথা শুনে রানী খুব ভয় পেয়ে গেলেন। এদিকে রাজা রাজবাড়ির সবাইকে সকালে ঘুম থেকে উঠতে মানা করে দিলেন। 

সকালে হাট বাজার বন্ধ করার আদেশ করলেন। রাজার এই প্রতিজ্ঞার কথা এক গরিব বামুনের কানে গেল। বামুন ভাবলেন রাজা যার সাথে মেয়ের বিয়ে দেবেন তাকে কিছু ধন সম্পতি নিশ্চয়ই দেবেন। সেই ভেবে তিনি তার আঠারো বছরের ছেলেকে নিয়ে রাজবাড়ীতে লুকিয়ে রইলেন। তিনি তাঁর ছেলেকে বলে দিলেন রাজা ঘুম থেকে উঠলেই যেন ছেলে রাজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সকালে রাজা ঘুম থেকে ওঠার পর বামুনের ছেলে রাজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ছেলেটিকে দেখে রাজা জিজ্ঞাসা করতে ছেলে কিছু বলার আগেই বামুন রাজার সামনে এসে বললেন, “আমি আপনার প্রতিজ্ঞার কথা জানি। এই আমার ছেলে। আমার ছেলের সাথে আপনার মেয়ের বিয়ে দিয়ে আপনার প্রতিজ্ঞা রক্ষে করুন।”

রাজা তাই করলেন। সঙ্গে কিছু ধন দিয়ে মেয়েকে বিদায় করলেন আর বিদায়ের সময় বললেন, “এতদিন আমার ভাগ্যে খেতে এবার নিজের ভাগ্যে খাওগে।”


বামুন অপর এক রাজার রাজ্যে বনের মধ্যে কুঁড়ে ঘরে থাকেন। সেখানেই ছেলে, ছেলের বউকে নিয়ে এলেন। বামুনের বউ তাঁদের বরণ করে ঘরে তুললেন। রাজকন্যা শ্বশুর শাশুড়ির সেবা যত্ন করে নিজের স্বামীকে খাইয়ে যা বাঁচে তাই আনন্দ করে খায়। একদিন তাঁর স্বামী আর শ্বশুরকে তিনি বললেন, “আপনারা যখন বাড়ি আসবেন তখন খালি হাতে আসবেন না। কিছু না পেলে একগাছি ঘাস নিয়েই আসবেন।” বামুন আর তাঁর ছেলেও তাই করতে থাকলেন। রোজ যা পান তাইই নিয়ে আসেন। এক দিন ভিক্ষায় বেরিয়ে কিছু না পেয়ে রাস্তায় একটি মরা কালসাপ দেখতে পেয়ে তাইই কুড়িয়ে নিয়ে এনে রাজকন্যাকে দিলেন। রাজকন্যা খুশি হয়ে সেই মরা কালসাপটাকে নিয়ে মাচায় তুলে রাখলেন। এই ভাবেই ভিক্ষা করে কুড়িয়ে বাড়িয়ে তাদের চলতে থাকল।


হঠাৎ সেই দেশের রাজার একমাত্র ছেলের কঠিন অসুখ হল। অনেক কবিরাজ দেখানো হল কিন্তু রোগ আরও বেড়ে গেল। শেষে এক সাধু এসে রাজাকে পরামর্শ দিলেন, “যদি মরা কালসাপের মাথা পাওয়া যেত তাহলে আমি এই ছেলেকে সুস্থ করতে পারতাম।” রাজার কথামত ঢেরা পিটিয়ে ঘোষনা করা হল যে মরা কালসাপের মাথা দেবে সে বা তারা যা চাইবে রাজা তাদের তাই দেবে। রাজকন্যা বামুনকে বললেন, “বাবা আপনি ওদেরকে ডাকুন আমি মরা কালসাপের মাথা দিচ্ছি।”


রাজার সেপাইরা এলে তিনি মাচা থেকে মরা কালসাপ নামিয়ে তার মাথা কেটে দিলেন। আর তা থেকে ঔষধ বানিয়ে সাধু রাজার ছেলেকে ভালো করে দিলেন। এরপর রাজবাড়ী থেকে বামুনকে ডেকে পাঠালে রাজকন্যা বামুনকে বলে পাঠালেন, “বাবা রাজামশাই আপনাকে ধন সম্পতি দিতে চাইলে আপনি নেবেন না। রাজাকে বলবেন আমি কিছুই চাই না, শুধু একটা প্রার্থনা। কার্তিক মাসের অমাবস্যার দিন রাজবাড়ী এবং অন্য প্রজার ঘরে যেন আলো না জ্বলে।”


বউমার কথামত বামুন রাজাকে সেই অনুরোধ করলেন এবং রাজাও তাইই মেনে নিলেন। তারপর ঢেরা পিটিয়ে ঘোষণা করলেন কার্তিকমাসের অমাবস্যায় রাতে যার ঘরে আলো জ্বলবে তার কঠিন শাস্তি হবে।


এই দিকে রাজকন্যে অমাবস্যার দিন উপোষ করে রইলেন। তারপর নিজের কুঁড়েঘর পরিষ্কার করে, একটা চৌকি পেতে তাতে আলপনা দিয়ে ফুল দিয়ে সাজিয়ে লক্ষ্মী পুজোর জোগাড় করলেন। তাঁর কুঁড়েঘরের চারদিকে প্রদীপ জ্বালিয়ে মা লক্ষ্মীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন। মা লক্ষ্মী পেঁচার পিঠে চড়ে পৃথিবীতে কার্তিক মাসের লক্ষ্মীপূজা দেখতে এলেন। পেঁচা মা লক্ষ্মীকে নিয়ে চারদিক ঘুরেও কোথাও আলো দেখতে পেলেন না। মা লক্ষ্মী তখন পেঁচাকে বললেন, “আজ আমার পুজো রাজ্যের কেউ আলো জ্বালিয়ে আমাকে আমন্ত্রণও জানালো না।”


তিনি ফিরেই যাচ্ছিলেন হঠাৎ পেঁচা বনের মধ্যে কুঁড়ে ঘরে আলো দেখতে পেয়ে মাকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হল।

ক্ষীরগ্রামের মা যোগাদ্যা শক্তিপীঠের ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক কথা - history of maa jogadya

সেখানে এসে তাঁরা দেখলেন বামুনের বৌমা কার্তিক মাসের লক্ষ্মীপূজা করছে এবং মা লক্ষ্মীর জন্য অপেক্ষায় বসে আছে। মা লক্ষ্মীকে আসতে দেখে গলায় কাপড় দিয়ে মাকে প্রণাম করলেন। তারপর মাকে চৌকিতে বসিয়ে ভক্তিভরে পুজো করলেন। পুজো শেষে মা লক্ষ্মীকে তিনি বললেন, “মা, আমরা খুব গরিব। এই যৎ সামান্য জোগাড় করেছি আপনার জন্য।”


এর পর মায়ের স্তব করলেন। মা লক্ষ্মী খুশি হয়ে বললেন, “আর তোমার কোনো অভাব থাকবে না,আমি তোমার পুজোতে খুব খুশি।”


এই বলে মা লক্ষ্মী রাজকন্যাকে তাঁর পায়ের নুপুর দিয়ে বললেন, “ ভাদ্র , কার্তিক, পৌষ আর চৈত্র মাসে আমার উদ্দেশ্যে এই নুপুরের উপর পুজো করবে, তোমার কোনও অভাব থাকবে না।”

এরপর বামুনের কুঁড়েঘর রাজপ্রাসাদ হয়ে গেল। তাঁদের দাস দাসী ধন সম্পত্তি কিছুরই অভাব থাকল না। রাজকন্যে একদিন বামুনকে বললেন,

“বাবা আমাদের এখন কোনো অভাব নেই। কিছু পুণ্য কর্ম করলে হয় না? আপনি একটা পুকুর খোঁড়ান আর রাজ্যের সব লোককে নিমন্ত্রণ করুন।”

বামুন তার বৌমার কথামতো তাই করলেন। রাজ্যের ধনী গরিব দলে দলে সবাই তাঁদের নিমন্ত্রণে এসে খেয়ে গেল। ওই দিকে রাজকন্যার বাবা মা লক্ষ্মীকে অবহেলা করায় তাঁর রাজ্যপাট সব গিয়ে তিনি পথের ভিখারি হয়েছিলেন। বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে তিনি তাঁর মেয়ের শ্বশুরবাড়ি যে রাজ্যে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে এসে সারা রাজ্যের সবার জন্য এই আমন্ত্রণ শুনে দুটো খাবার আশায় তিনি বামুনের বাড়ি এলেন। তাঁকে দেখে রাজকন্যা তাঁর বাবাকে ঠিকই চিনতে পারলেন। তিনি তাঁর শ্বশুরকে দিয়ে বাবাকে ঘরে আনিয়ে হাত পা ধুইয়ে সোনার থালা করে যত্ন সহকারে খেতে দিলেন। রাজা তাঁর মেয়েকে একেবারেই চিনতে পারলেন না। রাজা রাজকন্যার দিকে তাকিয়ে মুখে অন্ন তোলেন আর কেঁদে তাঁর বুক ভাসান। তখন রাজকন্যা রাজাকে কাঁদছে কেন জিজ্ঞাসা করলে রাজা বললেন, “আমিও এক সময় রাজা ছিলাম আর তোমারই মতো আমার একটা মেয়ে ছিল আমি তার উপর রাগ করে খুব গরিব ঘরে বিয়ে দিয়েছিলাম। জানি না সে এখন বেঁচে আছে কিনা।”


সেই শুনে রাজকন্যাও কেঁদে ফেললেন। তিনি বললেন, “আমিই আপনার সেই মেয়ে বাবা যাকে আপনি নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে বলেছিলেন। এবার দেখুন দেখি মা লক্ষ্মীই কিন্তু আমাদের অন্ন যোগাচ্ছে।” রাজা বললেন, “আর লজ্জা দিস না মা। আমার ভুলেই আজ এই অবস্থা।”

তিনি তাঁর বাবাকে লক্ষ্মী পুজো করার কথা বললেন। রাজাও তাঁর নিজের রাজ্যে ফিরে লক্ষ্মী পুজো করলেন। আর মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদে সব ফিরে পেয়ে তাঁর রাজ্যে এই লক্ষ্মীপুজোর প্রচার করলেন। এই ভাবে কার্তিক মাসের লক্ষ্মীপূজা পৃথিবীতে প্রচারিত হল। 
সেই থেকেই প্রচলিত আছে কার্তিক মাসে লক্ষীপূজা ও প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা।
যদিও শহরে এসব আর দেখা যায়না। কিন্তু গ্রামে এসব এখনো প্রচলিত। 

COMMENTS

BLOGGER
নাম

পৌরাণিক-কাহিনী,12,স্মৃতিরখাতা,2,pouranik-kahini,13,shakti-peeth,6,shivratri,2,Utsav,19,
ltr
item
পুরাণ কুটির: কার্তিক মাসের লক্ষ্মী পূজার পৌরাণিক কথা - যেভাবে শুরু হল কার্তিক মাসের লক্ষ্মী পূজা ও বাড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা।
কার্তিক মাসের লক্ষ্মী পূজার পৌরাণিক কথা - যেভাবে শুরু হল কার্তিক মাসের লক্ষ্মী পূজা ও বাড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা।
কার্তিক মাসের লক্ষ্মী পূজা ও বাড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা শুরুর ইতিহাস ও গল্পকথা। কার্তিক মাসে প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মী পূজা পাঁচালী ব্রতকথা |
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgT0jNGlo9qcUsfJNZLWD7EoMghUkwPnR5D41p0xHjDFVeD7anebpZ5xa_3e6a3y0LvjmCMP6ZN769ZITMH0vACQslMFub9PWSmQtyTOU7cDm-WWnA3y0ULxOi00u_7WtUF71pnKkymAkvRwSGUhxDlrRGlPcGRuWMssy3KMyasqCbTrF54he6TPrAYQZO6/w640-h592/Lakshmi%20puja.jpg
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgT0jNGlo9qcUsfJNZLWD7EoMghUkwPnR5D41p0xHjDFVeD7anebpZ5xa_3e6a3y0LvjmCMP6ZN769ZITMH0vACQslMFub9PWSmQtyTOU7cDm-WWnA3y0ULxOi00u_7WtUF71pnKkymAkvRwSGUhxDlrRGlPcGRuWMssy3KMyasqCbTrF54he6TPrAYQZO6/s72-w640-c-h592/Lakshmi%20puja.jpg
পুরাণ কুটির
https://purankutir.blogspot.com/2023/10/laxmi-pura-in-kartick.html
https://purankutir.blogspot.com/
https://purankutir.blogspot.com/
https://purankutir.blogspot.com/2023/10/laxmi-pura-in-kartick.html
true
4791467589055299150
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy